| |
ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা রোমান সম্রাটদের চেয়েও বেশি: রাজ্জাকPublished: 2012-07-12 ঢাকা, ১২ জুলাই (রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম)-- মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের আদেশ রোমানদের ক্ষমতার চেয়ে বেশি বলে মন্তব্য করেছেন আসামীপক্ষের প্রধান আইন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আসামীপক্ষের করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের সামনে এ মন্তব্য করেন। সকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া ১৫ সাক্ষীর জবানবন্দিকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনালের দেয়া আদেশের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয় ট্রাইব্যুনাল-১। আসামীপক্ষের করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর আসামীপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আদালতের আদেশ মানি, মানতে বাধ্য। তবে এ আদেশের পর যেহেতু আর রিভিউ করা বা আপিল করার সুযোগ থাকছে না তাই আমরা ন্যায় বিচার বঞ্চিত হবো। ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা আগের রোমান সম্রাটদের চেয়ে বেশি। ট্রাইব্যুনালের এ আদেশকে ভ্রান্ত এবং ভুল উল্লেখ করে আসামীপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, আমাদের দেয়া ডকুমেন্ট প্রমাণ করার সুযোগ না দিয়ে ট্রাইব্যুনাল যে আদেশ দিয়েছেন তাতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, আমরা এতো সব ডকুমেন্ট দিয়েছি তারপরও ট্রাইব্যুনাল আমাদের এ বিষয়ে প্রমাণ করতে বলছে। আমরা সাক্ষীদের বিষয়ে সাড়ে ৬শ থেকে ৭শ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট দিয়েছি। সে সব ডকুমেন্ট প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি। তিনি বলেন, সেফ হাউজে থাকা একজন সাক্ষীকে হুমকি দেয়ার বিষয়ে যাত্রাবাড়ি থানায় ডায়েরি করা হয়েছে। ডায়েরি নম্বর ৪৯১। সেফ হাউজে দায়িত্বরত একজন পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে সাক্ষ্য দিতে গেছে। সে তথ্যও লেখা রয়েছে সেফ হাউজের ডায়েরিতে। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, কোন পুলিশ কোনদিন দায়িত্ব পালন করেছে, কোন ফার্নিচার দোকান থেকে আসববাপত্র কেনা হয়েছে তার টেলিফোন নম্বরও লেখা আছে। কয়টি কম্বল, জগ, মগ, ভাতের চামচ, থালা বাসন বালিশ কেনা হয়েছে তার সবই উল্লেখ আছে ডায়েরিতে। গৌরাঙ্গ নামে একজন সাক্ষী ভাল সাক্ষ্য দেয়ায় মিস্টি খাওয়ানো হয়েছে, সিগারেট কিনে দেয়া হয়েছে সে তথ্যও লেখা আছে। কোন দিন কোন সাক্ষী এসেছে, কার সাথে কোন কোন মেহমান ছিল, কে কয়বেলা খেয়েছে, কাকে কখন চা আপ্যায়ন করা হয়েছে, কাকে কোন হাসপাতালে নিয়ে রক্ত পরীক্ষা এবং অন্যান্য চিকিৎসা করা হয়েছে, কাকে কোনদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে, তার সাথে কোন কোন পুলিশ ছিল সবই ডায়েরিতে লেখা আছে। আমরা এসব ডডকুমেন্ট হাজির করেছি এবং তা যে সত্য তারও প্রমাণ দাখিল করেছি। তিনি বলেন, তারপরও ট্রাইব্যুনাল আমাদের প্রমাণ করার কথা বলেন। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, এ যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পের কাদম্বিনী চরিত্র। কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করেছিল যে, সে মরে নাই। অন্যদিকে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, আমরা যে গ্রাউন্ডে সাক্ষ্য গ্রহণের বিষয়ে বলেছি সে গ্রাউন্ডের জবাব আসামিপক্ষ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেফ হাউজের ডকুমেন্টকে জাল করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আসামিপক্ষ তাদের ডকুমেন্ট সত্য প্রমাণ করতে পারেনি তাই ট্রাইব্যুনাল তাদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দী তাদের অনুপস্থিতিতে আদালত সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে গত ২৯ মার্চ রায় দেন। সে রায় পুনরায় বিবেচনার জন্য গত ৯ মে রিভিউ আবেদন দাখিল করেন মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী। এরপর কয়েক দফা শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আদেশের জন্য ট্রাইব্যুনাল বলেন, সিএভি (কোর্ট এডজর্নড ফর ভারডিক্ট) । অর্থাৎ রায় না দেয়া পর্যন্ত এ বিষয়টি মুলতবি রাখা হল। গত ৩ জুন শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী রাজ্জাক সেফ হাউজের (ঢাকায় যেখানে সাক্ষী এনে রাখা হত) সমস্ত কাগজপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে বলেন, সাক্ষী হাজির করতে না পারা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যে কারণ দেখিয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তারা কোর্টে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতকে প্রতারিত করেছেন। অনেক সাক্ষী তাদের হেফাজতেই ছিল এবং সেফহাউজের এসব কাগজপত্রে তার প্রমাণ রয়েছে। তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, সেফ হাউজ বলতে আমাদের কিছু নেই। তারা সেফ হাউজের নামে যে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন এই রিপোর্ট আমাদের না। এটি তাদের প্রডাকশন। হতে পারে এটি তাদের প্রডাকশন। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, বিটিসিএলের টেলিফোন বিল অনুসন্ধান করে দেখা গেছে সেফ হাউজে বর্ণিত উক্ত তিনটি টেলিফোন বিলে ঠিকানা উল্লেখ আছে ৬৪৫, অতীশ দিপঙ্কর রোড, পুলিশ টাওয়ার বিল্ডিং, গোলাপবাগ, ঢাকা। বিলে ইংরেজিতে নাম হিসেবে উল্লেখ আছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল । তিনি বলেন, এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট, এটা প্রমাণের জন্য যে, সমস্ত ডকুমেন্ট সত্য। দ্বিতীয় প্রমাণ হিসেবে ব্যারিষ্টার রাজ্জাক বলেন, সেফ হাউজে দায়িত্বরত এসআই কাল চাঁদ ঘোষ চকবাজার থানার মামলা নম্বর ৪১ (০১)১০ জিআর ১০২/১০ ইং তারিখ ১২-০১-১২ মূলে সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য সিএমএম কোর্ট নম্বর ৩১-ঢাকা এর উদ্দেশ্যে রওনা দেয় লেখা আছে। রাজ্জাক বলেন, কালাচাঁদ যে কোর্টে সাক্ষ্য দিতে গেল তা আমাদের পক্ষে জানা কেমন করে সম্ভব? আপনারা প্রয়োজনে ঐদিন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের কাগজপত্র তলব করেন। তাহলেই সত্যতা বের হয়ে যাবে। ব্যারিস্টার রাজ্জাক আরো কয়েকটি উদাহরণ পেশ করে বলেন, ৬০০ পৃষ্ঠার যে ডকুমেন্ট দিয়েছি তার ভেতরে যেসব তথ্য আছে তা এ ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করে। এসব তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের সময় ট্রাইব্যুনাল ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কাছে জানতে চান এসব তথ্য সত্য হলে কি হবে বলেন। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, আমাদের আবেদন শুধু ১৫ সাক্ষীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেনা। আমরা মাওলানা সাঈদীকে পুরো মামলা থেকে অব্যাহতি চাচ্ছি। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনাদের দাবি হল ১৫ সাক্ষী বিষয়ে প্রসিকিউশন মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। কিন্তু ঐ ১৫ জন সাক্ষী ছাড়া যে, ১৬ জনের জবানবন্দী কোর্টে নেয়া হয়েছে এবং জেরা হয়েছে তাদের সাক্ষ্য কিভাবে বাতিল করা যাবে? ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, যারা ১৫ জন সাক্ষীর বিষয়ে এভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন তাদের অন্য বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা কি? তারা তাদের ক্ষেত্রেও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। এ মামলা সম্পূর্ণ মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এ মামলার কোন ভিত্তি নেই। ট্রাইব্যুনালের অপর বিচারপতি আনোয়ারুল হক বলেন, চার্জ গঠনের পর ডিসচার্জ করার কোন সুযোগ নেই। হয় দোষী না হয় খালাস পাবেন বিচারে। জবাবে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, এখানে সিআরপিসি কার্যকর নেই। এটা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। কাজেই চার্জ গঠনের পর তা বাতিল করা যাবেনা তা কোথাও বলা নেই। সাঈদী বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ইব্রাহিম কার্ডিয়াক (বারডেম) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অসুস্থতার কারণে ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার অনুপস্থিতিতেই বিচার চলছে। উল্লেখ্য তদন্ত কর্মকর্তার জেরা চলাকালে গত ১৩ জুন সাঈদীর বড় ছেলে রাফিক বিন সাঈদী (৪৩) ট্রাইব্যুনালে এসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরে ১৪ জুন প্যারোলে মুক্তি পেয়ে ছেলের নামাজে জানাজায় ইমামতি শেষে কারাগারে ফেরার পর মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন সাঈদী। তার থেকে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম/জেডকে/আরআই_ ১৬৩৭ ঘ. |