সর্বশেষ সংবাদঃ

জাতীয় সম্মাননা, অতিরিক্ত কিছুই ভালো নয়

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ২২ অক্টোবর,২০১২
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার জন্য বিদেশি বন্ধুদের গত শনিবার সম্মাননা দেয়া হলো। এটি আরও অনেক আগে আরও অনেক গুরুত্ব দিয়ে করে গোটা জাতিকে একত্র করে দেয়া যেত, যা হয়নি, হয়নি। কিন্তু যেটুকু হয়েছে তার জন্য সরকারকে অবশ্যই আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। সেইসঙ্গে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা দেশবাসীর সামনে তুলে না ধরে পারছি না। কথাগুলো তেমন কঠিন নয়, একেবারে সাদাসিদে। যাদের সম্মাননা দেয়া হয়েছে, তারা কি যথার্থ সম্মাননা পাওয়ার মতো? এখানে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পছন্দ-অপছন্দহীন যাচাই-বাছাই করা হয়েছে? যেমন শাবানা আজমীর বাবার সম্মাননা পদক শাবানা আজমীরের হাতে দেয়া হলো। বিষয়টা যেমন যথার্থ, আনন্দবাজার গ্রুপের অভীক সরকারকে সম্মাননাটা না দিয়ে তার বাবা অশোক সরকারকে দিলে কেমন হতো?

অভীক সরকার তো মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন একজন ছাত্র। আনন্দবাজারের সম্পাদক ছিলেন তার বাবা অশোক সরকার। সম্মাননা দিতে গিয়ে কোনো বাছ-বিচার করা হলো না। সামরিক, বেসামরিক—সবাইকে এক কাতারে ফেলা হলো। মুক্তিযুদ্ধে যে বিদেশি বন্ধুরা রণাঙ্গনে শত্রুহনন করেছে, রক্ত ঢেলেছে, সেই ভারতীয় মিত্রবাহিনী আর যারা নিরাপদে সমর্থন জুগিয়েছেন তাদের একাকার করে না ফেললেই কি ভালো হতো না?

মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন ছোট-বড় বাছবিচার নেই—সবাই মুক্তিযোদ্ধা। যে কারণে কারও কোনো মর্যাদা নেই। বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননার ক্ষেত্রেও সবাই এক। এক ক্লাসে শত শিক্ষার্থী থাকলে সবাই কি একসঙ্গে ফার্স্ট হয়? এখানে তা-ই করা হলো। আরেকটু ভাবলে কি ভালো হতো না?

বঙ্গবন্ধুর অবরুদ্ধ পরিবারকে মুক্ত করেছিলেন বলে অশোক তারাকে সম্মাননা দেয়া হয়েছে। ভদ্রলোক তখন ছিলেন ক্যাপ্টেন। আর সানসিং বাবাজী মহাবীর চক্র ছিলেন তখনই ব্রিগেডিয়ার। ভদ্রলোক নতুন ব্রিগেডিয়ার হয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের উদ্ধারে যে গল্প ফেঁদেছেন তা মোটেই সত্য নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে একজন ক্যাপ্টেন মেজরের কোনো কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব থাকে না। নেতৃত্ব আসে আরও ওপর থেকে। নিয়মিত বাহিনীতে যারা কাজ করে তারা ‘বাধ বেটা বাধ, খসা বেটা খসান।’ কর্তার ইচ্ছে কর্ম। তখন তো ছিল আরও কঠিন। অবরুদ্ধ ঢাকায় ভারতীয় বাহিনীর তেমন কোনো সৈন্যই ছিল না।

বঙ্গবন্ধুর অবরুদ্ধ পরিবারের মুক্তির জন্যে কোনো উপহার-উপঢৌকন দিতে হলে তা দিতে হবে কাদেরিয়া বাহিনীকে। আমাকে বাদ দিলেও কমান্ডার বীর বিক্রম সবুর খানকে, বীর বিক্রম হাবিবুর রহমান, বীর প্রতীক হাকিম, বীর প্রতীক সাইদুর, মকবুল হোসেন তালুকদার খোকা, বজলু, ভম্বল, আরিফ আহমেদ, বীর প্রতীক আবদুল্লাহ, বীর প্রতীক ফজলু ও সিক্স বিহার রেজিমেন্টের কর্নেল এবং সিক্স বিহার রেজিমেন্টকে। সর্বোপরি মিত্র বাহিনীর এসবের জন্য কেউ যদি সম্মাননা বা প্রতীক পায় তাহলে মেজর জেনারেল নাগরা, ব্রিগেডিয়ার সান সিং ও ব্রিগেডিয়ার ক্লেরের পাওয়া উচিত।

১৮ ডিসেম্বর ’৭১ পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনীর আর অন্য কারও কোনো উপস্থিতি ছিল না। ইদানীংকালে জেনারেল জ্যাকব নামে এক ভদ্রলোক হয়তো টাকা-পয়সা খেয়ে নানা গল্প ফাঁদছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ময়দান দেখেননি, অফিসে বসে সর্দারি করেছেন। নতুন ব্রিগেডিয়ার অশোক তারা বর্তমান জমানার ভারতীয় সিক্সটিন্থ ডিভিশনের এ এক নতুন সংস্করণ। বেলা নেই তাই কথাগুলো বললাম।

এর আগেও এক পর্ব বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা দেয়া হয়েছে। দাওয়াত পাইনি, কিছু বলিনি। সরকারি দলের সঙ্গে মতান্তর থাকলেও রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো মতান্তর নেই। যোগ্য ভালো লোক ছাড়াও কত আলানী, মালানী, কুড়ানী দাওয়াত পেল, আমি কেন পেলাম না। ওই অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাওয়ার যোগ্যতা কি আমি অর্জন করিনি? ব্রিগেডিয়ার সান সিং বাবাজী মহাবীর চক্র বেঁচে আছেন, আমার জানা ছিল না। ভারতীয় সেনাবাহিনীর এ মহামানবের মুক্তিযুদ্ধের অবদান কোনোকিছু দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। তাকে সম্মাননা দেয়া হলো। কাজটি যথার্থই প্রশংসার। সম্মাননা দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সম্মাননা দিলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। ’৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নাগরা, ব্রিগেডিয়ার ক্লের, ব্রিগেডিয়ার সান সিং বাবাজী ও আমি যখন শত্রুকবলিত ঢাকা দখল করতে টাইগার নিয়াজীর গুহায় যাই, তখন তারা কোথায় ছিলেন?

’৭১-এ আমার অবরুদ্ধ বাংলাদেশকে মুক্ত করতে সান সিং এসেছিলেন। সম্মাননা নিতে তিনি যখন এবার ঢাকায় এলেন, যেভাবেই হোক এখনও যখন বেঁচে আছি আমাকে কি তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া যেত না? ৬১ বিদেশি যুদ্ধ বন্ধুকে সম্মান জানানো হয়েছে। ৬০ জনকে না হয় সম্মাননা পদকটি তারাই দিতেন। যেহেতু আমরা একসঙ্গে ঢাকা বিজয় করেছিলাম, আজকের মহাবীরেরা কেউ সেদিন ছিলেন না। আমার হাত দিয়ে অন্তত ব্রিগেডিয়ার সান সিং বাবাজী মহাবীর চক্রকে দেশের এই সম্মান দিলে কী এমন ক্ষতি হতো? কেন এমন হীনমন্যতা? কেন এত দৈন্য?

এত বিদেশিকে সম্মাননা দিচ্ছেন—সরকারের একবারও কি মনে পড়ে মমতাজ খান পাঠান নামে কাদেরিয়া বাহিনীর একমাত্র একজন বিদেশি মুক্তিযোদ্ধা ছিল? পাকিস্তানের ১১ জনকে সম্মাননা দেয়া হলো, তাকে কেন দেয়া হলো না? ৭৬ বছর বয়সী পাঠান মমতাজ খান নিঃস্ব-রিক্ত, হাসপাতালে শয্যাশায়ী। তার এখনও পাকিস্তানে হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমর্থন করে প্রত্যক্ষ অংশ নিয়ে আজ সে পথের ভিখারি। এক চোখে নুন আরেক চোখে তেল বেচার এ কেমন সম্মাননা? হয়তো কেউ বলে বসবেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। ওটা কাদের সিদ্দিকীকে বলা যেতে পারে, কারণ তার সার্টিফিকেট নেই, কিন্তু মমতাজ খানের বেলায় খাটে না, তার অনেক অনেক সার্টিফিকেট আছে। শুধু কাদের সিদ্দিকীর নয়, আতাউল গনি ওসমানীর এবং স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সার্টিফিকেট আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু তো অপাঙেক্তয়। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কল্যাণ ট্রাস্ট, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়—সব জায়গায় সরকারি স্বীকৃতি আছে একজন পাঠান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে কাদেরিয়া বাহিনীতে ছিল বলে একজবানের মানুষ পাঠান মমতাজ খান কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে বিশ্বঘাতকতা করেনি বলে না হয় তাকে সম্মাননা নাই দেয়া হলো, কিন্তু অনুষ্ঠানে দাওয়াতটা তো করা যেত? এসব কী হচ্ছে? মনে রাখবেন, রাষ্ট্র বা জাতি কারও পদানত থাকে না চিরদিন।

বৃহস্পতিবার ছিল শেখ রাসেলের জন্মদিন। বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলের ১৮ অক্টোবর জন্মদিন জানাই ছিল না। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মদিন, এটাও বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে জানতাম না। প্রথম জেনেছিলাম ’৭৮-’৭৯ সালে দিল্লিতে। এখন তো না জেনে পথ নেই। শোরগোল করে ঘুম থেকে টেনে তুলে চোখে আঙুল দিয়ে জানানো হবে কার জন্মদিন। দেশের যে অবস্থা তাতে ঢাকঢোল পিটিয়ে জন্মদিন পালনে খুব একটা স্বার্থকতা খুঁজে পাই না। তবে জন্মদিন প্রতিটি মানুষের জন্যেই বিশেষ আনন্দের। আত্মীয়-স্বজন বা প্রিয়জনদের কাছেও দিনটি যথার্থই মহিমাময় উদযাপনযোগ্য। নিশ্চয়ই জন্মদিন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করা উচিত। তবে আন্তরিকতাহীন ভালোবাসা-বিবর্জিত শুধু দেখানোর জন্য, নাম ফাটাতে জন্মদিন পালন করা অনেকটাই গুনাহর নামান্তর। যদিও এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রাণের ছোঁয়া না থাকলেও শান-শওকত উচ্ছ্বাসের কোনো কমতি থাকে না। বেশিরভাগই দেখাতে ব্যস্ত। এবার প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে তেমন ঢাকঢোল বাজেনি। কারণ তিনি জাতিসংঘে ছিলেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যার দিন ১৫ আগস্ট ১৮ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন ঢাকঢোল পিটিয়ে পালন করা হয়। অনেক বলেছি, বন্ধুরা, মানুন বা আর না মানুন, ওই মহামানবের জন্ম না হলে কারোরই এত শান-শওকত হতো না। আপনাদের জন্মদিন, আপনারা খুশি হন ভালো কথা, কিন্তু অন্যকে ব্যথা দিয়ে কারো খুশী হওয়ায় নির্মল আনন্দ কোথায়? না, কেউ ভালো কথা শোনে না। ভালো কথা বললে গালি, নোবেল পেলে তিরস্কার। এখন ভাবতে হবে বড়সড় কোনো কুকাজে বিশ্বজয় করে প্রশংসা পাওয়া যায় কিনা? বেগম খালেদা জিয়া সৌদি আরবে ছিলেন, তবুও বেশ ঘটা করেই কেকটেক কাটা হয়েছে। পবিত্র মাহে রমজান ছিল বলে কিছুটা রক্ষা। একজন সৌদি আর একজন জাতিসংঘে ছিলেন বলে এ যাত্রায় কিছু ফুলটুল বিক্রি কম হয়েছে। বছর পনেরো আগে একবার কে এক বড় মাপের আওয়ামী নেতা বলেছিলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনে ১৬ টন ফুল পেয়েছেন, যা পচে পরদিনই দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে।

আমরা কেউ এ থেকে শিক্ষা নিই না। ওই ১৬ টনের জায়গায় ১৬টি ফুল হলে অথবা ১৬ কেজি হলে কোনো ক্ষতি হতো না। ১৬ টনের কোনোই প্রয়োজন ছিল না। ওটা অপব্যয়। হাসরের ময়দানে স্রষ্টা রাব্বুল আল আমিন এ নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন করবেন। জবাব দেয়ার যে কোনো পথ থাকবে না, এটা কোনো আইনবিদ বা বিশেষজ্ঞদের কাছে শুনতে হবে না। আওয়ামী নেতা মাপঝোক করে ফুলের ওজন বলেননি। পরদিন থেকে দু-তিন দিনে চার ট্রাক পচা ফুল ফেলতে হয়েছে। তাই আন্দাজ করে বলেছিলেন। যারা নেতানেত্রীদের এত শ্রদ্ধা-ভালোবাসা দেখান, তারা যদি তার মা-বাবাকে একটা ফুল দিয়ে হাতে-পায়ে চুমু খেতেন, আল্লাহ রেকর্ড করে রাখতেন। কারণ বাবা-মা সন্তানের বেহশতের চাবিকাঠি। দেখানোর জন্য অত তোড়া না নিয়ে একটা করে ফুল নিয়ে যদি মহান নেত্রীর কাছে যেতেন, বাকি অর্থটা রাস্তায় যে কোনো পেরেশান মানুষের হাতে ভিক্ষার মতো নয়, শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে দিতেন, তাহলে নেত্রীর জন্যে, তার পরিবারের জন্য আল্লাহর দরবারে কতই না সওয়াব লেখা হতো।

যারা বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যার দিনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন করেন, তারা যদি মেহেরবানি করে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, ওই অর্থ গভীর শ্রদ্ধায় তাদের হাতে তুলে দিতেন, তাহলে তাদের কারো চিকিত্সা, কারো সন্তানের লেখাপড়া, কারো হয়তো একবেলা পেট ভরে খাওয়া হতো। তাতে আল্লাহ তায়ালা বিএনপির ওপর থেকে বালা-মুসিবত দূর করে দিতে পারতেন অথবা জিয়া পরিবার আল্লাহর কিছুটা ছায়া পেতে পারত। ঈদুল আজহার প্রাক্কালে এসব লিখতাম না, কিন্তু ঘটা করে রাসেলের জন্মদিন পালনে আমার অন্তরাত্মা কেমন যেন নড়ে উঠেছে। আপনা-আপনি কলমের ডগা থেকে কথাগুলো বেরিয়ে এলো। মাফ করবেন, ফুল পচে গেলে দুর্গন্ধ হয়, ঘরে রাখা যায় না, ফেলে দিতে হয়। ফুল এবং ফলের সজীবতাই প্রাণ। বোঁটা থেকে ছিঁড়ে ফেললে অবধারিত মৃত্যু। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ব্যাপারটাও অনেকটা তা-ই। জনগণ থেকে আলাদা হলে পচতে বেশি সময় লাগে না। নীতিহীন আদর্শচ্যুত কেউ বেশি দিন রাজনীতিতে টিকতে পারে না। প্রকৃত আদর্শে রাজনীতিকদের হয়তো কষ্ট আছে, পেট ভরে না, তেমন জৌলুস নেই, কিন্তু স্থায়িত্ব অনন্তকাল।

প্রায় পনেরো দিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আমার স্ত্রী অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহর অধীনে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ভিসি প্রাণ গোপাল সব সময় দেখাশোনা করেছেন। ১৭ অক্টোবর নাসরীন বাড়ি ফিরেছে। বিছানাতেই আরও নাকি ১০-১৫ দিন থাকতে হবে। ১৭ অক্টোবর ১২টায় হঠাৎ দেখি বস্ত্রমন্ত্রী বড় ভাই এলেন। কানের সমস্যায় কয়েকদিন বাইরে ছিলেন। আমার ছেলে-মেয়ে-স্ত্রীকে তিনি সন্তানের মতোই দেখেন। ৮-৯ মাস পর তার সঙ্গে দেখা। চোখ-মুখ দেখে বেশ ভালোই লাগল। হঠাৎ করে বললেন, ‘বজ্র, ঈদের দিন গ্রামের বাড়ি ছাতিহাটি যেতে হবে। নতুন মসজিদে সব ভাইয়েরা একসঙ্গে নামাজ পড়তে চাই।’ আমি ‘হ্যাঁ’ ছাড়া ‘না’ বলতে পারিনি।

যদিও সব সময়ই আমি টাঙ্গাইল নামাজ পড়ে কোরবানি দিয়ে ছাতিহাটি যাই, কিন্তু বড় ভাইয়ের হুকুমে ছাতিহাটি নামাজ পড়ে টাঙ্গাইল ফিরে কোরবানি দিতে হবে। টাঙ্গাইলে ঈদের জামাত হয় সকাল সাড়ে ৮টায়, ছাতিহাটিতে হবে ১০টায়। তাই ছাতিহাটিতে নামাজ পড়ে টাঙ্গাইল এসে কোরবানি দিতে বেলা ১২টার কম হবে না। যারা কোরবানি দেয়, তাদের কোরবানির আগ পর্যন্ত আল্লাহর নামে রোজা থাকতে হয়, এটাই নিয়ম। তাই আমাকেও থাকতে হবে। মাহে রমজানে সারাদিন রোজা থাকতে পারলে কোরবানির দিন আধা বেলা কেন পারব না? রোজা না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যার প্রতিবাদে প্রায় ২৫ বছর ১৫ আগস্ট সারা দিন উপোস থেকেছি, পানি পর্যন্ত স্পর্শ করিনি। সে তো আমার কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহর নামে কোরবানির আগ পর্যন্ত রোজা রাখলে সামান্য হলেও আল্লাহ দয়া করলেও করতে পারেন।

বিদায় দেয়ার জন্য পুরো টিমসহ অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ এসেছিলেন। ভিসি প্রাণ গোপাল এসেই আমাদের দুই ভাইকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছিলেন। আমাদের দুই ভাইকে সব সময় খুব একটা একত্র পান না। এখন তো দুই মেরুতে থাকায় তেমন ওভাবে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। প্রাণ গোপাল আমাকে ছোট ভাই, লতিফ ভাইকে বড় ভাই ডাকে। আমাদের পরিবারে আমরাই ছোট-বড় দুই ভাই, বাকিরা শুধুই ভাই। আওয়ামী লীগ ছাড়ার পর মনে করতাম পায়ে হাত দিয়ে সালাম করায় প্রাণ গোপালের কোনো কৃত্রিমতা থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু না, কোনো কৃত্রিমতা নেই। স্বাধীনতার পরপর ছোট্ট প্রাণ গোপাল যেমন ছিলেন, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বিশাল প্রাণ গোপাল সেই একই রকম আছেন, কোন পরিবর্তন হয়নি। বড় ভাইকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছিলাম। যারা দেখেছে তাদের মধ্যে হিতৈষীরা কেউ কেউ পরে বলতে চেষ্টা করেছেন, আপনি করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বড় ভাই আওয়ামী লীগ। প্রকাশ্য পায়ে হাত দিয়ে ওভাবে সালাম করলে রাজনীতিতে প্রভাব পড়বে। একটু কৌশলী হন।

বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, ‘আরে, বেকুবের দল, সারা জীবন যখন কোনো কৌশল করলাম না, এখন শেষবেলায় আর কৌশল করে কী হবে? ঘরে সালাম করা যাবে, বাইরে যাবে না, আমার আল্লাহর ক্যামেরা সব জায়গায় থাকে। মা নেই, বাবা নেই, ব্যক্তিজীবনে তিনিই আমাদের বাবা। পল্টন ময়দানে প্রকাশ্য জনসভায় দেখা হলে সেখানেও পায়ে হাত দিয়ে সালাম করব, এটাই আমার পারিবারিক তাজিব তামাদ্দুন। তাতে রাজনীতি থাকলে থাকবে, না থাকলে না থাকবে। আমার কিছু আসে-যায় না। বাবাকে বাবাই বলব। লাভের আশায় দুলাভাইকে বাপ ডাকতে পারব না।’ জানি না আমরা নামতে নামতে আরও কত নামব।

দোয়া করবেন স্ত্রী ঘরে এসেছে। সে যেন সুস্থ হয়ে ওঠে। প্রিয় পাঠক ঈদের আগে আর আপনাদের পাব না। তাই অন্তরের গভীরতম স্থান থেকে শুভ কামনা জানাই, জানাই ঈদ মোবারক। ঈদ আপনাদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ ও স্বস্তি। আল্লাহ তার রুহানি ছায়াতলে গোটা দেশবাসীকে আশ্রয় দান করুন আর স্নেহের রাসেলকে করুন বেহশতবাসী। আমীন।

কাদের সিদ্দিকী: কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি

সূত্র: আমার দেশ, ২২ অক্টোবর ২০১২

অন্যান্য কলাম

adv

ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: ০১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com , info@real-timenews.com