সর্বশেষ সংবাদঃ

  • হোম
  •   সাক্ষাৎকার

ভাড়া বিদ্যুতের হাতি পালতে দেশ বিপন্ন

বিডি রহমাতুল্লাহ ১৭ জানুয়ারি,২০১৩
বিডি রহমাতুল্লাহ

আবারো বাড়ানো হচ্ছে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পেলে আগামী সপ্তাহেই নতুন দাম ঘোষণা দিতে পারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রতিষ্ঠানটি ইঙ্গিত দিয়েছে, গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৩-৪ শতাংশ বাড়ানো হতে পারে। জানুয়ারি থেকেই বাড়তি দাম কার্যকর হবে।

এরআগে গত সেপ্টেম্বরে বিদ্যুতের দাম পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৯২ ও খুচরায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে আইনের আশ্রয়ের হুমকি আগেই দিয়ে রেখেছে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

এই খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ানোর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ রেন্টাল বা কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্রের ওপর সরকারের নির্ভরতা। বিদ্যুত পরিস্থিতি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমাতুল্লাহ রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম- এর সাথে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। পাওয়ার সেলের এই সাবেক মহাপরিচালকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আতাউর রহমান

প্রশ্ন: রেন্টাল বা কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট কেন স্থাপন করা হয়?


উত্তর: স্বাভাবিক বিদ্যুতকেন্দ্র কাজ না করলে রেন্টাল বা কুইক রেন্টালভিত্তিক (ভাড়া ও দ্রুত ভাড়া) বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। বিশেষ করে যুদ্ধাবস্থায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমেরিকা কুইক রেন্টাল স্থাপন করেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনসেও একবার করা হয়েছিল। পাকিস্তানে দিয়েছিল চুরির জন্যে কিন্তু সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট সেটা বন্ধ করে দিয়েছে। শ্রীলঙ্কায় একবার আসার কথা ছিল, তারা চালায়নি। মালয়েশিয়ায় মাহাথীর মোহাম্মদ ক্ষমতায় থাকাকালীন একবার আনা হয়েছিল। তিনি সবকিছু বিবেচনা করেই এটা করেছিলেন। কারণ, তিনি দেখেছেন যে তার ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেশি হচ্ছে, আর বিদ্যুতের ডিমান্ডের চেয়ে মাত্র অর্ধেক ক্যাপাসিটি আছে। একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে তিনি এটা করেছিলেন। তবে তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে এক বছরের ভেতরে চলে যেতে হবে।

প্রশ্ন: কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বলতে আসলে কি বুঝায়?


উত্তর: এটা রেডিমেড হবে। অর্ডার দিলেই চলে আসবে। এটা কোন স্থানীয় এবং স্থায়ী প্রকল্প না। উন্নত দেশগুলোর নিজস্ব কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকে, যেগুলো তারা ভাড়া খাটায়। ভিয়েতনামে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে আমেরিকার বিদ্যুতের দরকার পড়ে। কিন্তু স্থানীয় কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এগুচ্ছে না। তাদের পক্ষে এটা বানানো অসম্ভব। বাইরের কোন প্রতিষ্ঠানও রাজি হচ্ছিল না। কারণ, তাদের ওপর হামলা হতে পারে; বোমা, গ্রেনেড ছুড়তে পারে। মহামুশকিল হয়ে গেল। তখন তারা কিছু আমেরিকান কোম্পানিকে বললো যে তোমরা এসে বানাও। রাজি হল না আমেরিকান কোম্পানিগুলোও। তাদের বলা হলো, এক কাজ করো, আমাদের তো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় লাগে, আজকে এই জায়গায়, কাল ওই জায়গায়। তোমরা রেডিমেট কিছু পাওয়ার স্টেশন বানাও, যেটা এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় টেনে নেওয়া যায়। যখন যেখানে লাগে, সেখানে আমরা নেওয়ার ব্যবস্থা করব। স্বাভাবিক বিদ্যুতকেন্দ্র ২৫ বছরের জন্যে বসানো হয়। কিন্তু কুইক রেন্টাল নরমালি এক জায়গায় এক বছর, ছয় মাসের বেশি থাকে না। জেনারেটর ভাড়া করার মতো।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে কি কুইক রেন্টাল কার্যাদেশ দেয়ার মতো অবস্থা ছিল বা আছে?


উত্তর: কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের কোনো পরিস্থিতিই বাংলাদেশে নেই। বাংলাদেশে এটা কার্যাদেশ দেয়ার মতো না। কুইক রেন্টাল দিলে উৎপাদনে যেতে কেন দুই বছর লাগবে? যাদের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে তাদের রেডিমেড পাওয়ার স্টেশন ছিল না। সবাই একটা রাজনৈতিক দলের সমর্থক, শুভান্যুধ্যায়ী। তারা কার্যাদেশ পাওয়ার পর স্টেশন কেনা শুরু করল। এটা তো কুইক রেন্টাল হতে পারে। আর এটা যেহেতু অন্যায়, তাই তারা দায়মুক্তি দিয়েছে। সাধারণত কুইক রেন্টালে দরপত্র ডাকা হয় না। বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে এমন কাউকে ডেকে উৎপাদনের আদেশ দেয়া হয়। সরকার এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। দুর্নীতিবাজ নেতা-কর্মী ও ব্যবসায়ীদের কুইক রেন্টালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যেহেতু দ্রুত উৎপাদনে যেতে হয়, তাই উচ্চ দরে ট্যারিফ দেয়া হয়। যারা দায়িত্ব নেবে তাদের শর্তে দেয়া হয়। কারণে, এখানে ঝুকিঁ আছে। কিন্তু রেন্টাল যে পরিস্থিতিতে, যে শর্তে দেয়া হয়,তা কি তারা পূরণ করতে পেরেছে। নির্দিষ্ট সময়ে ত একটাও আসতে পারি নি। রেন্টালের কার্যাদেশের পরেও অনেক পাওয়ার  স্টেশন এখনো নির্মাণ হয়নি। সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে, তা আসলে কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্র না। কিছু লোককে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে হবে, তাই দেয়ার উপলক্ষ মাত্র।  এছাড়া, এগ্রিকো ছাড়া কারও রেডিমেট পাওয়ার স্টেশন ছিল না।

প্রশ্ন: কোম্পানিগুলো দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে কেন?

উত্তর: তাদের বেশি পয়সা দিবে কেন? বিদেশ থেকে পুরনো যন্ত্রপাতি কিনে এনেছে, সাথে সাথে বসায়নি। এরপরেও স্টেশন চালাতে তেল সরবরাহ করতে হবে সরকারকে। এতসব শর্ত পুরণ করার পরেও ঠিকমতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করেনি। এটাকে কোনোমতেই রেন্টাল বলা যাবে না। তারপরেও সরকার টেরিফ পাঁচ টাকার জায়গায় চৌদ্দ টাকা দিয়েছে। এই যে নয় টাকা বেশি, এই ট্যারিফটা দেশের মানুষের করের টাকায় দেয়া হয়েছে। এসব রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ছাড়া আর কি! তারা বলছে গ্যাস সংকটের কারণে তেলভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র করা হয়েছে। অথচ দেশে গ্যাসের সংকট নেই। যেহেতু গ্যাস ঠিক করতে দেরি লাগবে, সামনে নির্বাচন, অবৈধ পয়সা উপার্জনের সময় হাতে কম, তাই তেলভিত্তিক করা হয়েছে।

প্রশ্ন: কুইক রেন্টালে কি পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে?

উত্তর: তেল, যন্ত্রপাতিসহ সবকিছু বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করতে হয়েছে। এতে আমার হিসাবে এক হাজার মেগাওয়াট যদি চালায়, তবে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। তিনটা উপায় ভর্তুকি যাচ্ছে। বেশিরভাগ ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র পুরনো বলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খাচ্ছে। পুরনো যন্ত্রে তেল বেশি যায়। ভাড়ায় ১২ হাজার কোটি টাকা, তেলের জন্য ১২ হাজার এবং পুরনো যন্ত্র বলে অতিরিক্ত তেল খরচ হয় চার হাজার কোটি টাকা। গেলো বছর এ রকমটাই দিয়েছে। এটা প্রত্যক্ষ ক্ষতির হিসাব। এছাড়া অপ্রত্যক্ষ ক্ষতি-পরিবেশের ওপর, অর্থনীতির ওপর যে প্রভাব, তাতে ক্ষতি হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, অর্থনীতির চাকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশ দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। যেখানে ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নেয়ার কথা সেখানে ২১ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। সরকার এই অর্থ ঋণ নিয়ে কোম্পানিগুলোকে দিয়েছে। শর্তানুযায়ী এটা তাকে দিতে হয়েছে। কয়েকটা গোষ্ঠি দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্যে এই অবৈধ প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

প্রশ্ন: তাহলে আপনার মতামত কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া উচিত?

উত্তর: হাতি পালতে গিয়ে বাড়ি বেচতে পারি না। এই রেন্টালের হাতি পালতে গিয়ে দেশ বিপন্ন করতে পারি না। রেন্টালকে বন্ধ করতেই হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমি একটা হাতি কিনলাম, মালামাল আনা-নেয়ার জন্যে। দেখা যাবে মালের চেয়ে হাতির বোঝা ভয়াবহ। হাতি পালতে গিয়ে আমাকে ঘরবাড়ি বেচতে হচ্ছে। তাই আজকে যদি রেন্টাল বন্ধ করে দেই, কালকে দেশ কোটি কোটি টাকার অপচয় থেকে বেঁচে যাবে।

প্রশ্ন: দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হতে পারে কিভাবে?

উত্তর: পুরনো বিদ্যুতকেন্দ্রগুলো রিপেয়ার করতে বলেছি। এগুলো বসিয়ে রাখার কোনো অর্থ হয় না। আজ একটা, কাল আরেকটা এভাবে সবগুলো ঠিক করা দরকার। তাতে ছয় থেকে ১২ মাসের ভেতরে সাতশ থেকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে। খরচ পড়বে দুইশ’ কোটি টাকা, চুরি করলে আর একশ’ অর্থাৎ তিনশ’ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে বাপেক্সকে দিয়ে গ্যাস ওঠাতে হবে। বেশ কয়েকটা কুপ ব্যবস্থাপনা করলে প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট কোটি ঘনফুট গ্যাস উঠাতে পারতো। ছোট ছোট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র বসাতে পারে।  আরএবিতে থাকতে পঞ্চাশ থেকে ষাট মেগাওয়াট এভাবে তৈরি করেছি। একসাথে যদি তারা একশ’ ঠিকাদারকে এভাবে ত্রিশ-চল্লিশ মেগাওয়াট করে গ্যাসবেইস বিদ্যুতক্ষেত্র দিত, তাতে দুই হাজার মেগাওয়াট এসে পড়ে। একশটা না দিয়ে পঞ্চাশটা দেই, তাতেও একহাজার মেগাওয়াট আসে। এই ব্যবস্থাপনাটুকু করতে এক থেকে দেড় বছর সময় লাগবে। এছাড়া, আমাদের দেশে খুব খারাপ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়। এতে ষাট ওয়াটের ফ্যান চালাতে একশ’ বিশ ওয়াট খরচ হচ্ছে। এসি চলছে বেশি ওয়াটে অর্থাৎ বেশি বিদ্যুৎ খাচ্ছে, বেশি বিল দিচ্ছি। দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে দেড় থেকে দুই মেগাওয়াটের চাহিদা এমনিতেই কমে যেত। এতে সরকারের পয়সা লাগতো না, সংকট দূর হতো।

পানি, বাতাস, সূর্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে সরকার। কুইক রেন্টালে যে সাবসিডি দিচ্ছে, তার অর্ধেকটা দিলেই হতো। ইনভেস্টমেন্ট কস্ট বেশি হলেও, একবার এই খরচটা করতে হতো, কুইক রেন্টালের মতো প্রতিদিন করতে হতো না। এখানে পানি, বাতাস,সূর্য, গ্যাস তাকে আর কিনতে হবে না, এটাত আল্লায়ই বিনা পয়সায় দিয়ে দিয়েছে। একবছর খরচ করে ফেললে পনের কিংবা বিশ বছরে আর হাত দিতে হবে না।

রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম/এআর/এমএ/এমআই_ ২১৪৯ ঘ.

অন্যান্য সাক্ষাৎকার

adv

ফোন: +৮৮০-২-৮৩১২৮৫৭, ফ্যাক্স: +৮৮০-২-৮৩১১৫৮৬, নিউজ রুম মোবাইল: ০১৬৭৪৭৫৭৮০২; ই-মেইল: rtnnimage@gmail.com , info@real-timenews.com