এনামুল হক কাশেমী
পাহাড়ি জনমানুষের প্রিয়নেতা বোমাং রাজা অংশৈ প্রু চৌধুরী আর নেই। ৯৮ বছর বয়সে বুধবার (৮ আগস্ট ২০১২) তিনি বান্দরবানের রাজবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে পুরো পাহাড়ি উপত্যকাজুড়ে নেমে এসেছে শোক। নিরব নিস্তব্ধ স্বয়ং পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ও।
নবম বোমাং গ্রী সাক হ্নাই ঞোর পঞ্চম পুত্র প্রয়াত কুমার থুই অং প্রু চৌধুরীর পুত্র রাজা অংশৈ প্রু চৌধুরী। ১৯১৫ সালের ১ আগস্ট রোববার বান্দরবন রাজবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিডস বিদ্যালয়ে ইংরেজি মিডিয়ামে লেখাপড়া করেন। স্কুল জীবন শেষ করে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় স্কটিস চার্জ কলেজে ভর্তি হন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অংশৈ প্রু কলেজ জীবন শেষ করতে পারেননি। ১৯৪১ সালে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম ফ্রন্টিয়ার পুলিশ ফোর্স বিভাগে সরাসরি সাব-ইন্সপেক্টর পদে যোগদান করেন।
লোভী মহাজনদের আগ্রাসন হতে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার্থে তিনি ১৯৫৭ সালে বান্দরবান মহকুমায় একটি কো-অপারেটিভ গঠন করেন। তার একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় বহু বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ১৯৬৭ সালে বান্দরবান সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ব্যাংকের প্রথম সম্মানসূচক সেক্রেটারি ছিলেন এবং ১৯৯৮ সাল পযর্ন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দরিদ্র ও অসহায় জনগণের মহাজনী প্রথার হাত থেকে রক্ষার জন্য তিনি একটি নায্যমূল্যের দোকান দেন। সমাজসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বিনয়ী এই মানুষটি ১৯৬২ সালে সেরা নয়জনের একজন সমবায়ী হিসেবে পুরস্কার পান।
১৯৫৫-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত অংশৈ প্রু বান্দরবান উচ্চ বিদ্যালয়ের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। তার আপ্রাণ চেষ্টায় ১৯৬৫ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তার নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯৬৫ সালে মাত্র ৫ জন পরীক্ষার্থী নিয়ে তিনি বিদ্যালয়টিকে এসএসসি সেন্টার-এর রূপায়ন করেন, যাতে পাসের হার ছিল শতভাগ।
তখন থেকে বিদ্যালয়ের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এসবের জন্য তাকে প্রচুর শ্রম ও কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পালনকালীন তিনি স্ব উদ্যোগে বান্দরবান সদরে আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা (এসটিডি) এবং ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করেন। তার উদ্যোগেই ১৯৮১ সালে বান্দরবান জেলা হিসেবে উন্নীত হয়।
১৯৬০-১৯৬৬ সালে অংশৈ প্রু চৌধুরী বান্দরবান সদরের প্রথম ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার স্বচ্ছ কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি পরপর তিনবার বান্দরবান মহকুমার শ্রেষ্ঠ ইউপি চেয়ারম্যান মনোনীত হন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা কাউন্সিলের প্রথম নির্বাচিত ভাইস-চেয়ারম্যানও ছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি সামাজিক ও জাতীয় বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
বর্ষীয়ান এই রাজা ১৯৫৪-১৯৬২ বুদ্ধিষ্ট এডুকেশন এডভাইজরি বোর্ডের মেম্বার, বান্দরবান কলেজের গর্ভনিং বডির ভাইস-চেয়ারম্যান, বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সেক্রেটারি, ভাইস-চেয়ারম্যান-পার্বত্য চট্টগ্রাম ট্রাইবেল কনভেনশন, দ্বিতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট (সম্মানসূচক), বাংলাদেশ বুদ্ধিষ্ট কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৬৪ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম বিডি কনভেনশনে তিনি ১১ জন ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যানের একজন মনোনীত হয়ে অংশগ্রহণের পাশাপাশি ১৯৬৮ সালে শাহী ওয়াল বিডি কনফারেন্সে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করে ‘টি কে’ খেতাবে ভূষিত হন।
১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়, সমবায়, প্রাণী সম্পদ বিভাগ, বন ও পরিবেশ এবং মৎস্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনসম্পদ, সিভিল এভিয়েশন, পর্যটন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেন।
বর্ণাঢ্য জীবনে অংশৈ প্রু ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের সফল ১১ জন সমবায়ীদের একজন নির্বাচিত হয়ে জাতীয় পুরস্কার পান। তিনি একাধিকবার বিদেশ সফর করেছেন। ১৯৮০ সালে তিনি নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সফর করেন।
সমাজসেবার সাথে খেলাধূলাতেও বোমাং রাজা ছিলেন অসামান্য। ১৯৩৬ সালে তিনি বরিশালে অনুষ্ঠিত ভলিবল ম্যাচে চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রপি লাভ করেন এবং ১৯৩৯ সালে ওয়াইএমসিএ হতে টেবিল টেনিস খেলায় রানার্সআপ পদক পান।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সার্কেল চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল এবং বোমাং সার্কেলে বিভক্ত। ঐতিহ্য এবং প্রথাগতভাবে চাকমা সার্কেল ও মং সার্কেলে রাজা নিয়োগের প্রথা এক হলেও বোমাং সার্কেলে তার ভিন্নতা রয়েছে। বোমাং সার্কেলে পুরুষ বংশের উত্তরসূরীদের জ্যেষ্ঠতম ও যোগ্যতম ব্যক্তিকে রাজপদে আসীন করা হয়। অভিষিক্তকরণের ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনার বা সদাশয় সরকারের মনোনীত প্রতিনিধিই সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।
বোমাং রাজা অংশৈ প্রু চৌধুরীর অভিষিক্ত অনুষ্ঠান ১৯ নভেম্বর’ ১৯৯৮ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম বিভাগ সাখাওয়াত হোসেন সম্পন্ন করেন। গত ১ আগস্ট তিনি ৯৮ বৎসরে পদার্পণ করেন। আর গতকাল বুধবার (৮ আগস্ট ২০১২) সকাল সোয়া ৯টায় মৃত্যুতে সবার মাঝে স্মরণীয় হয়ে রইলেন বোমাং রাজা অংশৈ প্র চৌধুরী। রাজা বাহাদুর স্ত্রী, ৬ ছেলে ও ২ মেয়েসহ নাতি-নাতনি রেখে গেছেন তার উত্তরসূরি হিসেবে।
৯ আগস্ট ২০১২, বৃহস্পতিবার, বান্দরবান
লেখক: বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি, রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম