ভারতে মৌসুমের গতিবিধি নির্ধারণে ব্যাপক গবেষণা
|
 |
 |
 |
|
Sun 22 Jul 2012 11:06 PM BdST
|
বিশ্ব ডেস্ক, ২২ জুলাই (রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম)-- ভারতের বিজ্ঞানীরা এবার মৌসুমের গতিবিধি ও রকম ফের নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন।
মৌসুমের আগমন বা চলে যাওয়া অর্থাৎ ঋতুর বৈশিষ্ট সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ও স্থায়ী ধারণা সৃষ্টি এ প্রচেষ্টার লক্ষ্য। আর এটি সম্ভব হলে ভারতের কৃষি অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমনিতে ঋতু বা মৌসুমের চরিত্রগত বৈশিষ্ট বেশ পাল্টাচ্ছে। অথচ কৃষি, মৌসুমকে অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়।
সে অনুযায়ী মাঠে ধান লাগিয়ে হয়ত বৃষ্টির আশায় বসে থাকে কৃষক। বৃষ্টি নেই। তাই কৃষকের সেচের খরচ বেড়ে যায়। আবার ধান যখন পাকতে শুরু করেছে তখন বলা নেই কওয়া নেই বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যায় কৃষকের সমস্ত পরিশ্রম।
তাই ভারতের বিজ্ঞানীরা সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করে মৌসুমের একটা মডেল তৈরি করছেন। যা অন্তত মৌসুমের পূর্বেই কৃষককে বলে দেবে এবার মৌসুমের চরিত্র কি হবে। কখন খরা থাকবে আর কখন আকাশ থেকে নেমে আসবে বৃষ্টি।
আর সেই মৌসুম মডেলকে অনুসরণ করে কৃষিবিদরা তাদের চাষাবাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু নির্ধারণ করে ছক করে দেবেন।
খরা, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কৃষিকে রক্ষা করে কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলাই এ গবেষণার লক্ষ্য।
ভারতের বিজ্ঞানীদের ধারণা এ গবেষণা সফল হলে ভারতের ৬শ’ মিলিয়ন কৃষকের জীবন পাল্টে যাবে।
বৃষ্টি কখনো কৃষকের জীবনে আসে আশীর্বাদ হয়ে, কখনো তা বন্যা হয়ে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই মৌসুমের যে কম্পিউটার মডেল তৈরি করা হবে তাতে মৌসুমের প্রকৃতি, আসা যাওয়া, শুরু ও শেষ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকবে।
বিশেষ করে মৌসুম কখন বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে সে সম্পর্কে থাকবে আগাম সতর্কতা।
ভারতের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ১৫ ভাগ। কখনো মৌসুমই হয়ে ওঠে প্রকৃত অর্থমন্ত্রী।
তবে মৌসুমের গতিবিধি যাই হোক না কেনো, কৃষিতে পানিই হচ্ছে অন্যতম ভরসা। আর তা যদি হয় বৃষ্টির পানি তাহলে তা কৃষিতে সবচেয়ে সস্তা ও অধিক লাভজনক একটি উপকরণ হয়ে ওঠে।
ভারতের ভূ-বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের সচিব শৈলেশ নায়েক বলেন, কৃষিতে পানির সহজ উৎস নিশ্চিত করতে পারলেই চাষাবাদ অনেকটা সহজ হয়ে ওঠে।
ভারতে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পানির চাহিদার পূরণ হয় বৃষ্টি দিয়ে। কিন্তু মৌসুমের মতিগতি পরিবর্তন হলে এর হেরফের হয় আর এবার যা হয়েছে তাতে ভারতের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের ২০ লাখ মানুষকে বন্যায় অন্যত্র সরে যেতে হয়েছে, মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে শতাধিকে।
ভারতের কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ার আগেভাগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, এবার আবহাওয়া কৃষকের সাথে লুকোচুরি খেলতে পারে।
মৌসুমের এই লুকোচুরি ধরে ফেলে আগাম সতর্কতা আরো কতটা নিখুঁত দেয়া যায় সেজন্যে বিজ্ঞানীরা আকাশের দিকে আরো গভীর নজর রাখবেন।
এজন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের বিজ্ঞানীদের সহায়তায় ভারতের বিজ্ঞানীরা মৌসুমের জন্যে সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করে ‘সোর্স কোড’ নির্ধারণ করবেন যা স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে আবহাওয়া পূর্বাভাসের কম্পিউটার মডেল তৈরি করতে সাহায্য করবে।
এরফলে মৌসুমের পরিবর্তন ও প্রতিনিয়ত গতিবিধি পরিবর্তন থেকে বিজ্ঞানীরা আগাম সতর্কতা তৈরি করতে পারবেন।
এমন সতর্কতা কৃষিতে পানির সঠিক উৎস বিভিন্ন মৌসুমে কেমন হবে তা যাচাই করে কৃষকরা উপযুক্ত চাষাবাদ পরিকল্পনা নিতে পারবেন। নিতে পারবেন বন্যা আসার আগেই সতর্কমূলক প্রস্তুতি।
আর কৃষি পরিকল্পনা সঠিক হলে তাকে ভিত্তি করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আরো সঠিকভাবে নিতে পারবে বলে মনে করছেন ভারতের বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা আরো বলছেন, এখন কৃষকদের কৃষিতে অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। আবহাওয়া পূর্বাভাস কৃষি খাতের জন্যে বরং বলা চলে একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পানি সংরক্ষণ ও সঠিক মাত্রায় সেচ দেয়া একটা সমস্যাই রয়ে গেছে। এ সমস্যা সরকারকে আরো বাধ্য করছে কৃষিতে ডিজেল ভর্তূকি দিতে বাধ্য করতে, যার ফলে শুধু ধনী কৃষকরাই লাভবান হচ্ছে।
ভারতে অর্ধেক চাষযোগ্য জমিতে তুলা, ধান, গমের আবাদ হয় যা বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। মৌসুমের আগাম গতি প্রকৃতি বুঝতে পেরে সঠিক কৃষি পরিকল্পনা নেয়া মানেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সঞ্চয় কিংবা ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
আর তা সম্ভব হলে তখন গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তার পয়সা মোটরসাইকেল, রেফ্রিজেরেটরসহ বিভিন্ন পন্য কিনতে ভোক্তা শ্রেণীতে পরিণত হবে।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের সিনিয়র বিজ্ঞানী এস সি ভান বলেন, আমরা খুব চাপের মধ্যে আছি কারণ সবাই আবাহাওয়ার সঠিক ও স্পষ্ট পূর্বাভাস জানতে চায়।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তর গত এপ্রিলে এ বর্ষা মৌসুমে কি পরিমাণ বৃষ্টিপাত হবে তার আভাস দিয়ে জানিয়েছিল এবার মৌসুম হবে স্বাভাবিক। এটা গত পঞ্চাশ বছরের সামুদ্রিক তাপমাত্রা, বায়ুর গতিপ্রবাহ ও বাতাসের চাপ হিসেব করেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।
জুন মাসে আবহাওয়া পূর্বাভাস আরো হিসেব করে জুলাই ও আগস্ট মাসে বৃষ্টির পরিমাণ কতে হবে তা বলা হয়। এরপর ঘটে যায় অস্বাভাবিক বন্যা।
ভারতের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখানেই সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করে আরো নিখুঁত ও সঠিক পূর্বাভাস করার সুযোগ রয়েছে।
বেশিরভাগ সময় আবহাওয়া পূর্বাভাস সঠিক হয় না এমন উদাহরণ রয়েছে। ২০০৯ সালে মৌসুম স্বাভাবিক থাকার কথা বলা হলেও খরা দেখা দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রকৃতির গতিবিধি বা পরিবর্তন হিসেবে এনে বিজ্ঞানের উপকরণগুলো কাজে লাগাতে হবে।
তাহলে শুধু বৃষ্টি হতে পারে এমন পূর্বাভাসের বদলে ভারতের কোন প্রদেশে কোন সময়ে কতটুকু বৃষ্টিপাত হবে তা হয়ত বলা সম্ভব হবে। যা থেকে কৃষকরা আরো অধিক মাত্রায় লাভজনক হতে পারবেন।
বিজ্ঞানীরা আরো বলছেন, প্রচলিত আবহাওয়া পূর্বাভাসে শব্দের বাহুল্য থাকে অথচ তা খুবই স্বল্পমেয়াদের যা থেকে কৃষক দীর্ঘমেয়াদের কৃষি পরিকল্পনা নিতে পারে না। অন্তত এ পক্ষকালের জন্যে আবাহাওয়া পূর্বাভাষ পাওয়া গেলে কৃষকরা কি করতে হবে তা ঠিক করতে পারে।
আবহাওয়া পূর্বাভাস হতেও পারে, সম্ভাবনা রয়েছে এটা সাধারণ মানুষের জন্যে ভিন্ন রকমের মানে হলেও কৃষকের জন্যে তা জীবন মরণ সমস্যা।
ভারতের জাতীয় কৃষক কনসোর্টিয়ামের নেতা পি সেনেগাল রেড্ডি চান, পূর্বাভাস যতটা সুস্পষ্ট হয় ততই কৃষকের মঙ্গল।
কৃষক অধিকার আদায়ের নেতা কিশোর তেওয়ারী বলেন, মহারাষ্ট্রের অধিকাংশ কৃষক সার, বীজ, কীটনাশক কিনতে হাওলাত পর্যন্ত করে এবার ফসলে মার খেয়ে দিশেহারা। এজন্যে ভারতে কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছেই।
তিনি বলেন, অনেক কৃষক বাধ্য হয়েই কৃষিকে ভগবানের দয়ার ওপর নির্ভর করেন অথবা প্রকৃতিকে অদৃষ্টের খেয়াল বা নিজের পাপ বলেও মেনে নেন।
ওডিশার কৃষক ত্রিলোচা প্রধান যিনি সাত একর জমিতে ধানের আবাদ করেন, তিনি বলেন, ব্যাঙের ডাকে ধরে নেই বৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যাঙের ডাক খুবই অনিয়মিত হয়ে গেছে আজকাল।
এজন্যে ত্রিলোচা প্রধান জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেন।
রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম/ওয়েবসাইট/আরআই_ ১৭০৫ ঘ.
|
|
|
|
| পাঠকের মন্তব্য: |
| |
| |
| |
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন। সবগুলো ঘর পুরণ করা আবশ্যক: |
| |
|
|
|