জামায়াত বাঙ্গালী হত্যার লাইসেন্স দিয়েছে: মুনতাসির
|
 |
 |
 |
|
Mon 2 Jul 2012 1:35 AM BdST
|
ঢাকা, ১ জুলাই (রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম)-- মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন।
রোববার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনালে তিনি তার জবানবন্দি দেন।
ডকে দাঁড়িয়ে সাক্ষী মুনতাসির মামুন প্রথমেই তার পরিচয় দেন। পরে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে তিনি তার জবানবন্দি পেশ করেন।
সাক্ষী বলেন, আমার নাম মুনতাসির মামুন, বয়স ৬১ বছর, পিতার নাম মেজবাহ উদ্দিন।
সাক্ষী মুনতাসির মামুন বলেন, ১৯৬৮ সাল থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে সবচেয়ে সংকটময় ক্রান্তিকালীন সময়।
তিনি বলেন, ওই সময় আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতাম তাদের অধিকাংশই কোন না কোন ভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম বাঙ্গালী জাতির আশা আকাঙ্খা পরিপূরণে। আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা ক্রোধান্বিত করেছে আমাদের। এরপর উনসত্তরের গণ আন্দোলন। বাকি সব ইতিহাসতো কমবেশি আপনারা জানেন যা বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নাই।
সাক্ষী বলেন, সত্তরের নির্বাচনের পর আমরা ভেবে ছিলাম এই প্রথম আমাদের ন্যায্য দাবিগুলো পূরণ হবে। কিন্তু ১ লা মার্চের পর আমরা অনুধাবন করলাম হয়ত আবারো আমাদের বঞ্চিত করা হবে। শুধু এটুকু বলতে পারি আমাদের জেনারেশনের প্রায় সবাই পাকিস্তানের এ আচরণে রুব্ধ হয়েছিলাম।
সাক্ষী মুনতাসির মামুন বলেন, একাত্তর সালের ২৫ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত আমি মিরপুরের পল্লবীতে ছিলাম। ২৫ মার্চ রাতে গুলির শব্দে আমরা আতঙ্ক গ্রস্ত হয়ে পড়ি। কি ঘটছে তা দেখার জন্য আমরা বাড়ির ছাদে উঠি। তখন সেখান থেকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাই।
তিনি বলেন, এরপর ২৯ মার্চ আমি মিরপুর থেকে ঢাকায় ফিরে আসি। ঢাকায় এসে পুরানো ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় বন্ধু বান্ধবদরে খোঁজ করি। সে সময় দেখি পাকিস্তানী বাহিনী কি নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংস চালিয়েছে বাঙ্গালীদের উপর।
প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমের এক প্রশ্নের উত্তরে সাক্ষী মুনতাসির মামুন বলেন,খুব সম্ভবত অক্টোবর পর্যন্ত আমি ঢাকায় ছিলাম। সে সময় কয়েকটি পত্র পত্রিকা প্রকাশ হতো। তার মধ্যে ডেইলি অবজারভার, দৈনিক পাকিস্তান, সংগ্রাম ও পূর্ব দেশ। এ সব পত্রিকা পাকিস্তান সরকারের অধীনে ছিল।
সাক্ষী তার জবানবন্দিতে বলেন, ২৫মার্চের পর থেকেই যে সব দল পাকিস্তান সমর্থন করতো যথা জামায়াত ইসলামী, মুসলীম লীগ ও পিডিপি পাকিস্তান সরকার এবং তাদের সামরিক জান্তা জেনারেল টিক্কা খানের সাথে স্বদলবলে দেখা করেন। তার মধ্যে জামায়াত এবং মুসলীম লীগের ভুমিকা ছিল বেশি।
তিনি বলেন, তখন এ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান ছিলেন, নুরুল আমীন ও গোলাম আযম। তাদের উৎসাহ উদ্দীপনায় শান্তি কমিটি গঠিত হয়। এ সব কমিটিতে জামায়াতের প্রাধান্য ছিল বেশি। পরবতীতে দেখতে পাই অচিরেই তৃণমুল পর্যায়ে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়।
তিনি বলেন, যেহেতু সে সময়ে পাকিস্তান সরকারের সমর্থনকারী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের ভুমিকা ছিল বেশি। সে কারনে জামায়াতের কর্মীদের আধিপত্য ছিল বেশি।
জবানবন্দিতে সাক্ষী মুনতাসির মামুন বলেন, ১৯৭১ সালে জামায়াতের নেতারা বাঙ্গালীদের হত্যার জন্য লাইসেন্স দিয়েছেন।
তিনি বলেন, রাজাকারসহ বিভিন্ন শান্তি কমিটির নেতারা তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে কর্মীদের উৎসা, উদ্দীপনা দিয়েছেন। তাতে মনে হয়েছে তারা বাঙ্গালীদের হত্যার জন্য লাইসেন্স দিয়েছেন। এসব হত্যাকান্ড চালালে তাদের যে শাস্তি হবে সে বিষয়টিও তাদের নিশ্চিত করেছেন নেতারা।
সাক্ষী বলেন, আল বদর বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিল ছাত্রশিবিরের কর্মী। কতোটা মনুষত্ব বিবর্জিত হলে ছাত্ররা শিক্ষকদেরকে মিথ্যা কথা বলে গাড়ীতে করে নিয়ে হত্যা করতে পারে। এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় এবং ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে জানালেন গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী মুনতাসির মামুন।
তিনি বলেন ১৯৭১ সালের হত্যা, ধর্ষণ গুম, অগ্নি সংযোগ লুটের কথা স্মরণে আসলে এখনো গা শিউরে ওঠে। তিনি আরো বলেন, ওই সময় পাকিস্তানি বাহিনীকে যদি হত্যাযজ্ঞে বা পাকিস্তানের দোসরদের বিভিন্ন কর্মে বাংলাদেশী বিভিন্ন দলের লোকেরা সহযোগিতা না করতো তাহলে তারা আমাদের দেশে এতো ধ্বংস যজ্ঞ চালাতে পারতো না।
আর আমরা ৯ মাস সময়ের আগে মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হতে পারতাম। তিনি বলেন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে যে দলগুলো পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে এবং তাদের প্রতিনিধি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে কিভাবে সহযোগিতা করেছিলো।
পরে তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনের বর্ণনা দেন। কবে কি কি পুরস্কার পেয়েছেন তার কথা উল্লেখ করেন। পরে ইতিহাস ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়ে ১৯৭১ সালের তৎকালীন বিষয়ে বক্তব্য দেন।
সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শুরু হয়ে পৌনে ৩ ঘন্টার দীর্ঘ জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন আসামীপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম।
জেরায় আইনজীবী মিজানুল ইসলাম প্রশ্ন করেন স্বাধীনতার পূর্ব থেকে এখন পর্যন্ত কোন সময় গোলাম আযমের সাথে আপনার সাক্ষাত হয়েছে কিনা।
উত্তরে সাক্ষী বলেন, না, হয় নাই।
পরে প্রশ্ন করেন জামায়াতের কোন সভা সমাবেশে আপনি কোন সময় অংশ গ্রহণ করেছিলেন?
সাক্ষী বলেন, না।
আইনজীবী: আপনি ছাত্র অবস্থায় কোন ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন?
সাক্ষী: ছাত্র ইউনিয়নের সাথে।
আইনজীবী: ওই ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় বা কোন শাখার কমিটিতে ছিলেন?
সাক্ষী: না।
এ ছাড়া সাক্ষীকে প্রাদেশিক এবং জাতীয় পরিষদের নির্বাচন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়।
পরে ট্রাইব্যুনালের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় জেরার কার্যক্রম আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
এর আগে গোলাম আযমকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেল থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় হাজির করা হয়। পরে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হলে দুপুর ১২টার দিকে তার শারিরীক অবস্থা খারাপ বলে তাকে আবার হাসপতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
গত ২৪ জুন আসামীপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম মামলার কার্যক্রম ২ সপ্তাহ পেছানো এবং সাক্ষী গ্রহণ মুলতবির আবেদন করলে এবং রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী উপস্থিত না থাকায় ওই দিন মামলার কার্যক্রম পিছিয়ে ১ জুলাই দিন ধার্য করেন।
রোববার আসামীপক্ষের আইনজীবীরা গোলাম আযমের পক্ষে ২ হাজার ৯ শত উনচল্লিশ জন সাক্ষীর নামের তালিকা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন।
অপরদিকে রোববার ট্রাইব্যুনাল-১ এ জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সুচনা বক্তব্য দেয়ার দিন ধার্য ছিল। গোলাম আযমের মামলা চলতে থাকায় নিজামীর মামলা পিছিয়ে আগামী রোববার ৮ জুলাই দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল।
রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম/জেডকে/আরআই_ ১৯৩০ ঘ.
|
|
|
|
| পাঠকের মন্তব্য: |
| |
| |
| |
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন। সবগুলো ঘর পুরণ করা আবশ্যক: |
| |
|
|
|