Real-time News Network

মিনার মাহমুদ: স্মৃতিমধুর দিনগুলোর কথা


এবিএম সালেহ উদ্দীন

Mon 28 May 2012 5:42 AM BdST

rtnn

কিভাবে কোন দিক থেকে শুরু করবো। ভাবতেই আঁতকে উঠি। অবিশ্বাস্য(!) অথচ সত্য। মিনার মাহমুদ নেই। মিনার মাহমুদের মহাপ্রয়াণে কিং কর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছি।

অনেকে বলেছেন তিনি অভিমান করে চলে গেছেন। কিন্তু কার সাথে কিসের অভিমান(?) কিংবা কোন প্রতিকার  করার ছিল কিনা(?) সে বিষয়ে খুব একটা উল্লেখ নেই। একজন প্রচন্ড উদ্দমী তারুণ্যোদ্দীপ্ত মনের মানুষ এমন কী অভিমান, অভিযোগ ও অনুযোগে একটা অপ্রত্যাশিত কাপুরুষিত রং-এ নিজেকে চিত্রিত করে এমনভাবে অবেলায় চলে যাবেন! তা কোন অবস্থায় মেনে যায় না। এটা আমাদের সমাজ ও জাতীয় চেতনার প্রতি খুব পীড়াদায়ক, খুবই বেদনাদায়ক। 

মাত্র তিন মাস আগে ঠিকানায় প্রকাশিত আমার একটি লেখায় মিনার মাহমুদ প্রসঙ্গ ছিল। আশির দশকের মাঝামঝি বাংলা একাডেমী বইমেলায় মিনার মাহমুদের সাথে দেখা হয়েছিল। তারও আগে টিএসসি ক্যাফেটরিয়ায় দু একবার দেখা হয়েছে। তখন তিনি এবং আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের ছাত্র। তিনি মহসিন হলে থাকতেন। আর আমি থাকতাম শহিদুল্লাহ হলে। আমি আড্ডাপ্রিয় কিন্তু অনেকটা নীরব প্রকৃতির। তিনি দুরন্ত। কোন রাখঢাক নেই। যখন যেমন নিজেকে  মানিয়ে নিতে পারতেন। তবে আমাদের সমাজের চৌর্যবৃত্তির পারঙ্গমদের মতো তিনি সুবিধাবাদী ছিলেন না। সুবিধা লুপে নিতে অনেকে পারেন না। তিনি সুবিধাবাদী ছিলেন না বলেই হয়তো জীবনের খুব পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি। যেমন ছিলেন তেমনই রয়ে গেলেন।
 
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আবহে কিংবা কোলাহল মূখরতার মাঝে আমাদের যৌবনের আলোছায়ার কুহেলী আচ্ছন্নতায় অনেকেই ঝুকে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব বজায় রেখেও অনেকে বিভিন্নরকম কাজে জড়িয়ে পড়েন। প্রেম, আড্ডা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক কিছু। সবচেয়ে ফলপ্রসু হচ্ছে রাজনীতি করা। বড় কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে রাজনীতি করা। বিশেষ করে সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে রাজনীতি করে আমাদের যুগে অনেকেই অর্থকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিখ্যাত হয়েছেন। কেউ সরকারি দল, কেউ বিরোধী দল, আবার কেউ রাতারাতি বোল পাল্টিয়ে অবৈধ সামরিক শাসক এরশাদের পার্টি করে অল্প দিনেই কোটিপতি বনে গিয়েছিলেন। এমনকি স্বৈরাচারের আশির্বাদপুষ্ট হয়ে প্রকাশ্যে রেডক্রসের ডাকসাইটে নেতাকে নৃশংসভাবে খুন করে রাতারাতি পরিচিত হয়েছেন। জেলে গিয়েছেন কিন্তু ভয়াবহ হত্যাকান্ডে সরাসরি খুনি চিহ্নিত হয়েও সরকারি মদদে বেরিয়ে এলেন এবং এরশাদ সাহেব তাকে ভাই হিসাবে বুকে জড়িয়ে নিলেন। এছাড়া আওয়ামীলীগ, বিএনপি কিংবা জামাতি রাজনীতি করেও অনেক অপড়–য়া ছাত্র নেতাগণ বাড়িগাড়ি আর বিশাল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। অনেক বড় কপাল তাদের। অবশ্য এ জাতীয় ছাত্রনেতা কিংবা ছাত্রদের কেউ আবার রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির ঘেরাকলে পরে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছেন।

মিনার মাহমুদ ওসব কিছুই করেননি। ওসবের প্রতি কোন মোহ ছিল না। তার ছিল চেতনাপ্রখর অনুসন্ধিৎসু মন। যে মনের চোখ দিয়ে সমাজের অসঙ্গতি, অনাচারের মূখোশ খোলাসহ অনেক অজানা কিছুকে জন সম্মূখে প্রকাশ করে দিতে পারতেন সাহসিকতার সাথে। আবার তীক্ষèচোখের চাহনিতে অনেকের হৃদয়-মনকেও জয় করতে পারতেন। এই মন জয় করার কাহিনী তার বেলায় অনেক আছে। সংগত কারণেই আজকের লেখার প্রতিপাদ্য তা নয়।

তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। লেখালেখি করেছেন। অসম্ভব ক্ষুরধার ছিল তার লেখা। খুব বেশি নয়, মাত্র হাতে গোনা কিছু। এই অল্প লেখার মাধ্যমেও জগতে অনেকে পরিচিত এবং বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ইউরোপের বিখ্যাত কবি শেলী মাত্র তিরিশ বছর বেঁচেছিলেন। তার লেখালেখির সময় বারো বছরেরও কম সময়। কিন্তু অনাদিকালের জন্য তিনি বিখ্যাত তার কবিতার জন্য। বাংলা সাহিত্যের আরেক কবি সুকান্ত মারা যান মাত্র ছাব্বিশ বছরে। কিন্তু কয়েকটি কবিতা তাকে বিখ্যাত করে রাখে। আঠারো শতকের কবি ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৭-১৮৩১) বেঁচে ছিলেন মাত্র ২২বছর। কিন্তু মানবতার মুক্তির জন্য রেখে গেছেন অনেক কিছু।
মিনার মাহমুদও খুব বেশি লিখে যাননি। বলা যায় অনেকটা দ্বিধাদ্বন্দের দোলচালে কাটে তার বিরাট সময়। আশির দশকের গোড়ার দিকে সাপ্তাহিক বিচিন্তায় পরপর কয়েকটি ফিচারধর্মী অনুসন্ধানী শীর্ষ লেখায় তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। লেখার হাত ছিল বেশ বলিষ্ঠ। দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরও সর্বদা চোখ ছিল। তারপর সাপ্তাহিক বিচিন্তার মাধ্যমে সমগ্র দেশজুড়ে পরিচিতির জোয়ার নামে। বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যমোদী ছাত্র-ছাত্রী তথা যুব সমাজের মাঝে তিনি বিরটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। তারুণ্যাদ্দীপ্ত মুক্তমনের অধিকারীদের মাঝে বিচিন্তার অনেক পাঠক তৈরি হয়। মাত্র এক বছরের মধ্যে মিনার মাহমুদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিন্তা প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সারা বাংলাদেশে এমনকি বহি:র্বিশ্বেও বিচিন্তা’র পাঠক সংখ্যা বেড়ে যায় ঈর্ষনীয়ভাবে। আমি তখন সৌদি আরবের রিয়াদ বিশ্ববিদ্যায়ে অধ্যয়নরত। মনে আছে আমার ঠিকানায় বিচিন্তার কয়েকটি সাড়া জাগানো সংখ্যা পাঠানো হয়েছিল মিনার ভাই’র নির্দেশনায়। এই সাপ্তাহিকীটির মাধ্যমে তিনি আমার অন্তর জয় করেছিলেন। তার উপর আমার একটা গোস্বা ছিল। একটু খোলাসা করে বলি।

বাংলা সাহিত্যের সনামধন্য লেখক ও বুদ্ধিজীবি আহমদ ছফা একবার আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি যথারীতি ছফা ভাই’র কাছে গেলাম। বাংলামটরস্থ ছফাভাই’র বাসায় সর্বদাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’চারজন ছাত্র-ছাত্রী থাকতো। তাছাড়া অনেকেই যেতেন ছফা ভাই’র সাহিত্যের আড্ডায়। সেই আড্ডায় মিনারভাই এবং তার বন্ধু আমাদের তারুণ্যের কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহও দু একবার যোগ দিয়েছিলেন। তাছাড়া রুদ্র ছিলেন ছফা ভাই’র অতি ¯েœহভাজন। রুদ্র যখন হলি ফ্যামিলিতে দুরারোগ্য ব্যধিতে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। তসলিমা নাসরিন রুদ্র’র প্রিয় সহধর্মিনী। কিন্তু তখন উভয়ে এক অপরে ছিলেন অনেক যোজন দূরে। ছফাভাই চেয়েছিলেন রুদ্র’র এই করুণ সময়ে তসলিমা অন্তত: একবার মনের দেখাটা দিয়ে আসেন। সে জন্যই তসলিমার কাছে ছফা ভাই যেতে চাইলেন। এক কোলাহলমূখর সন্ধ্যায় ছফাভাই আমাকে সাথে করে তসলিমা নাসরিনের শান্তি বাগের ফ্ল্যাটবাড়িতে গেলেন। দীর্ঘসময় বাড়ির গেটে অপেক্ষা করে আমরা ফিরে এলাম। নাসরিন দেখা করেননি। অথচ ছফা ভাই’র সান্নিধ্যে রুদ্র-নাসরিন বহুবার গিয়েছিলেন। ছফা ভাই’র বিশ্বাস ছিল তসলিমা নাসরিন ছফা ভাই’র অনুরোধ রাখবেন। ছফাভাই খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তার কিছুদিন পর পত্রিকার পাতায় আহমদ ছফা’র লেখা ‘তসলিমা নাসরিন এবং স্পর্ষকাতর কিছুদিক’ প্রকাশিত হলো । পরে সেটি পুস্তক আকারে বের হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, সেই সময় মিনার মাহমুদের সাথে তসলিমা নাসরিনের প্রেমলীলা(!) তুঙ্গে; অত:পর বিয়ে। তারও অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের পর আবার তসলিমা ও মিনার মাহমুদের সাঙ্গপাত ঘটলো(!) সে কাহিনী সবার জানা।

যাই হোক কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ মনের কষ্টে ও ক্ষোভে ধুকে ধুকে মারা গেলেন। মিনার মাহমুদের উপর আমার গোস্বাটি ছিল তিনি তার বন্ধুর সুন্দরী স্ত্রীকে কেন ভাগালেন? এ ব্যাপারে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে কোন মন্তব্য না করাই শ্রেয় মনে করি।

যাই হোক, বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেও সাপ্তাহিক বিচিন্তা এরশাদ সরকারের রোষাণলে বন্ধ হয়ে গেল। সচিবালয়, হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট, পুরনো পল্টন, সেগুনবাগিচা, কাকরাইল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ সমগ্র ঢাকা শহরে পোস্টারে ছেয়ে গেল। পত্রিকাটির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবি সোচ্চার হয়ে উঠলো তার। আবছা আঁধারে কালোকাপড়ে চোখবাঁধা মানুষের ছবিতে সদৃশ্য পোস্টারটির আকুতির বড় অক্ষরে লিখা ‘আমাকে দেখতে দাও, আমাকে বলতে দাও’ এখনো চোখের সামনে ভাসছে। মিনার মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা ঝুলিয়ে এরশাদ তাকে জেলে পুড়লেন। সত্যচেতনা ও গণমানুষের স্বার্থের কথা বলার অপরাধে তিনি কয়েক মাস জেল খাটলেন। মিনার মাহমুদ পাঠকের নিকট আরো প্রিয় আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিলেন। কিন্তু এই উত্থানপর্ব বেশি দিন স্থায়ীত্ব পেল না।

বিচিন্তা বন্ধ হয়ে গেল। পরবর্তীতে বিচিন্তা প্রকাশ পেলেও সম্পাদক মিনার মাহমুদ মনের দিক থেকে আবার দ্বন্দ্ব-নিকষ দোলদোলায়মানে শেষ পর্যন্ত বিচিন্তা ছেড়ে দিলেন। একদিন শুনলাম তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন।

অন্তর দিয়ে চেয়েছিলেন সাপ্তাহিক বিচিন্তার অপরাজিত ভূমিকার মাধ্যমে তিনি  আমাদের সমাজ ও দেশের জন্য শ্রেষ্ঠতর ও মহত্তর কিছু করতে। সে জন্যেই ফিরে গিয়েছিলেন মাটির কাছে, মানুষের কাছে। অতীতের স্মৃতিমধুর দিনগুলোর কথা সবারই ভাল লাগে। কিন্তু কোন কোন স্মৃতি মানুষের মনকে ব্যথিত করে যখন স্মৃতির মানুষটি আর থাকেন না। আর মানুষের জীবনটাতো বিচ্ছেদেরই পরম্পরা। মিনার মাহমুদের সাথে এমনকিছু স্মৃতি আছে যা ভুলবার নয়।

আশির দশকের মাঝামাঝি অমর একুশের বইমেলায় বিচিন্তার একটি স্টল ছিল। আমি তখন বিদেশে পড়তে গিয়েছিলাম। শীতকালীন ছুটিতে দেশে এসেছি এবং বইমেলায় যাওয়ার বাড়তি সুবিধাটিও হাতের মুঠোয়। একদিন পড়ন্ত বিকেলে বন্ধুদের সাথে বইমেলায় গেলাম।

নবীন প্রবীণ লেখক-সাহিত্যিক আর অসংখ্য পাঠকপ্রেমি মানুষের পদভারে বাংলা একাডেমী চত্তর। ঐতিহাসিক বটমূলের পশ্চিমদিকের মধ্যখানে বিচিন্তার স্টলটি চোখে পড়লো। নতুন-পুরাতন সংখ্যা নাড়াচাড়া করা ছাড়াও মিনার মাহমুদের লেখা গল্পের বই ‘মনে পড়ে রুবি রায়’ বইটি দেখে কৌতুহলি হয়ে হাতে নিলাম। এরই মধ্যে মিনার মাহমুদ এসে হাজির। তার সাথে একঝাঁক তরুণ-তরুণীতে স্টল প্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে উঠলো। আমি ভেবেছিলাম তিনি আমাকে চিনতে পারবেন না। অ্যারে! সালেহ,
আমি বললাম হ্যাঁ। কেমন আছেন ? আমাকে আলিঙ্গন করে স্টলের ভিতরে নিলেন। প্রশ্ন করলেন কিভাবে চিনেছি জানেন? বললাম কীভাবে? উত্তরে বললেন সেই অমিতাভ স্টাইলের কানভরা চুল দেখে। আবার নিউইয়র্কে দাড়ি রাখা অবস্থায় অবাক হয়েছিলেন। যাইহোক, বইমেলায় জহির রায়হান রচিত ‘বরফ গলা নদী’ এবং মিনার ভাই’র লেখা নতুন বইটি হাতে নিয়ে বললাম আমি কিন্তু বই দু’টি কিনবো। নিশ্চয়ই, একদম পাকা রশিদ পাবেন;-বলেই হেসে উঠলেন মিনার ভাই। আমি বললাম, সিরিয়াস। আগে পুরাতন বই কিনতাম। এখন পকেট মোটামুটি গরম আছে । মিনার ভাই সত্যিই নিজের হাতে সদ্য প্রকাশিত ‘মনে পড়ে রুবি রায়’ বইটিতে আমার নামটি লিখে দিলেন। বিচিন্তার দুটি সংখ্যাসহ হাতে ধরিয়ে বললেন-চলুন, এবার চড়–ই পাখির দানাপানিতে আপ্যায়ন হবে।

অর্থ্যাৎ ফেরিওয়ালার চা। স্টলের বাইরে এসে মিনার ভাই বললেন; ‘দেখবেন আমিও একদিন চলে যাবো। এরশাদের চেলারা আমার হাত-পা ভেঙ্গে
দিতে পারে। দিন একটা বিদেশি সিগারেট।’ পকেট থেকে কারটিয়ারের একটি  প্যাকেট বের করে মিনার ভাই’র হাতে দিয়ে বললাম-অধমের সামান্য তোহফা।

মিনার ভাই আনন্দচিত্তে বলে উঠলেন-‘যদি গাহন করিতে চাও, এসো নেমে এসো, হেথা গহন তলে’। রবি ঠাকুরের বিখ্যাত লাইনটি শুনে একরাশ ধন্যবাদ জানিয়ে মিনার ভাই’র কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

এভাবেই কেটে গেল অনেক দিন। হঠাৎ একদিন দেখা হলো মালিবাগ চৌরাস্তা সংলগ্ন কসমস সেন্টারে। ইউএনবি ও কুরিয়ার সম্পাদক প্রবীন সাংবাদিক মরহুম এনায়েতুল্লাহ খানের অফিসে। দীর্ঘদিন আর যোগাযোগ ছিলনা। ১৯৯৮তে আমি স্বপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসার কয়েকমাস পর  বুদ্ধিজীবি আহমদ ছফাভাই যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং আমাদের চিলেকোঠায় প্রায় তিনমাস ছিলেন।

এসময় অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ ছফা ভাই’র সাথে যোগাযোগ করেছেন। অনেকে ফোনে আবার কেউ কেউ আমাদের বাসায় এসে ছফা ভাই’র সাথে দেখা করেছেন। এরই মধ্যে হঠাৎ একটি ফোন পেলাম। বোস্টন থেকে মিনার মাহমুদ।

আমার আমেরিকা আসার অনেক আগেই তিনি এসেছেন। মিনার ভাই’র ফোন পেয়ে ভীষণ খুশি হলাম। অনেক কথা হলো। আমি বললাম নিউইয়র্ক চলে আসুন। বললেন, ছফা ভাই’র সাথে দেখা করার ইচ্ছে করছে খুউব। কিন্তু নাহ্! ছফাভাই আমাকে দেখলে কষ্ট পাবেন। সম্ভবত: নাইন ইলেভেনের পর হঠাৎ একদিন ম্যানহাটানের টুয়েন্টি এইট এন্ড ল্যাক্সিটন এভিনিউতে মিনারভাই’র সাথে দেখা। বললেন-- নিউইয়র্কে  চলে এসেছেন আপাতত: অন্যত্র যাচ্ছেন না। ‘এখন সময়’ পত্রিকায় মাঝে-মধ্যে প্রকাশিত আমার দু’একটি লেখা তার নজর এড়ায়নি বলে জানালেন। এ সময় মিনার ভাই এই পত্রিকাটিতে পুরোদমে লেখা শুরু  করলেন। নিউইয়র্ক টেক্সি ড্রাইবারের বিষয়, তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর লিখা শুরু করলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের শাসনামলে বিশেষ করে ইরাক আগ্রাসন ও মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত পরিস্থিতির উপর ‘নিউইয়র্ক টাইমস, টাইম ম্যাগাজিন, নিউজ উইক, ডেইলি নিউজ’ পত্রিকা অবলম্বনে আমার লেখা বেশকিছু ফিচারধর্মী রচনার প্রশংসা করতেন। উৎসাহ দিতেন। প্রায়ই লেখার বিষয়বস্তু জানিয়ে সে বিষয়ে লিখতে বলতেন। নাইন ইলেভেনের পর শ্যারণ নির্দেশিত ইসরাইলিদের দ্বারা ফিলিস্তিনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাতসহ রামাল্লা,গাজাসহ বিভিন্ন উপত্যকা সমূহ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। অগণিত ফিলিস্তিনী যোদ্ধাসহ অনেককে ইসরাইলে কারাবন্দী করা হয়। নারীও শিশুসহ অসংখ্য ফিলিস্তিসি প্রাণ হারায়। মনে আছে ‘মারওয়ান বারগুতি’ নামক এক দুসাহসী ফিলিস্তিনি নেতা যিনি মহান নেতা আরাফাতের অনুসারি, যিনি প্রায় শতাধিকবার ইসরাইলিদের হাতে বন্দী হয়েছিলেন।

মিনার ভাই একদিন একটা ইংরেজি পত্রিকা আমার হাতে দিয়ে বললেন; আগামী সংখ্যায় ‘মারওয়ান বারগুতি’র উপর যেনো লিখি। আমি ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে উক্ত বিষয়ের উপর লিখেছিলাম। মিনারভাই ছাড়াও সে সময় মানবাধিকার নেতা পার্থ বাণার্জিও, ড,রণজিৎ কুমার দাদাসহ অনেকেই নিয়মিত ‘এখন সময়’ পত্রিকায় লিখতেন। প্রায়ই দেখা হতো তখন। মিনার ভাই’র সাথে কুইন্স এ কয়েকটি আড্ডায় যোগ দেয়ার সুযোগ হয়েছে। রুজভেল্ট এভিনিউ’র টেরেজা ক্লাব ছাড়াও চিত্রশিল্পীমনসুর আহমদের বাসায়ও আমাদের আড্ডা হয়েছে। আমি আর মনসুর ভাই হিউমেনিস্ট সেন্টারের যুক্ত ছিলাম। আমাদের সাথে ছিলেন পরিচালক ডেভিডআন্ডার্সন, সুস্মিতা মুখার্জি, ইউলান্দা, মার্থা, ক্যারলিনসহ আরও অনেকে। হিউমেনিস্ট অফিসে আমরা সাহিত্যের ছোটখাটো আড্ডাও করেছি। সেখানে মিনারভাই বক্তব্য দিয়েছেন এবং হুমায়ুন আজাদের কবিতা থেকে মুখস্থ আবৃত্তি করে সবাইকে আকৃষ্ট করেছিলেন। দেশে ফিরে যাওয়ার আগে একটি সপিং মলে দেখা হলে মিনারভাই জানালেন, অচিরেই চলে যাবেন। তারপর ঠিকই কযেকমাসের মধ্যেই বাংলাদেশে চলে গেলেন। যাওয়ার আগেরদিন কথা হয়েছিল। মিনারভাই বললেন শেষবারের আরও কিছু কেনাকাটা করছেন। জেএফকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার পর ফোনে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল। বলেছিলেন আপাতত: দৈনিক সমকাল পত্রিকায় বসার ব্যবস্থা হয়েছে। আমি ঢাকা গেলে অবশ্যই যেন দেখা করি। কিন্তু দুর্ভাগ্য দেখা আর হয়নি।
মৃত্যুবাসনা পূর্ণ করে তিনি চিরকালের জন্য চলে গেলেন।

ইহাইতো নিয়তি? অনেকের মতো মিনার মাহমুদ এসেছিলেন ভবে। আবার চলে গেলেন। আজ আর বাড়াবো না । কবিগুরুর একটি লাইন দিয়ে শেষ করবো। “ফিরবে না তা জানি/ আহা, তবু তোমার পথ চেয়ে জ্বলুক প্রদীপখানি।”
                                 
# এবিএম সালেহ উদ্দীন লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

ঢাকা, ২৭মে/রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম/মতামত/এসবি

                                           


শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
 
 
 
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন। সবগুলো ঘর পুরণ করা আবশ্যক:
কীবোর্ড Bijoy      UniJoy      Phonetic      English
নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 

 

অন্যান্য সংবাদ (মতামত)

কেউ কথা রাখেনি কাজী জহিরুল ইসলাম

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সময়ের দাবি শিখা ব্যানার্জী

আমাদের অর্থমন্ত্রী কাজী জহিরুল ইসলাম

প্রেমের মতো আর কিছু নয় আল মাহমুদ

সংকট থাকলে সমাধানও থাকে সতীশ চন্দ্র সরকার

চরবাসীরা কি মানুষ নয় ? শিখা ব্যানার্জী

সাদা মনের এক রাজা অংশৈ প্রুর সংগ্রাম

সেনা থেকে তালিবান? প্রশ্নের মুখোমুখি মুর্সি সব্যসাচী বসুরায় চৌধুরী

নগর পরিকল্পনায় কৃষি নিতাই চন্দ্র রায়

শুধু ২৪শে জুলাই আশিস পাঠক

পাকিস্তান-মার্কিন সম্পর্কে নতুন মোড় ফখরুজ্জামান চৌধুরী

তারপরও কি শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ হবে না? এস এ মাহমুদ

প্রথম অসামরিক নির্বাচিত ইসলামপন্থী গৌতম রায়

চন্দ্রকথা ফখরুজ্জামান চৌধুরী

কতটা পথ হাঁটলে পরে চাকরি পাওয়া যায়? তাজুদ্দিন আহমেদ

ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন, তবু আমরা ইস্যু খুঁজছি অশোক মিত্র

স্বার্থের সন্ধানেই দিল্লি মায়ানমারের পথে সব্যসাচী বসুরায় চৌধুরী

গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ: আমার শংকা ( দ্বিতীয় অংশ ) ড. মুহাম্মদ ইউনূস

গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ: আমার শংকা (প্রথম অংশ ) ড. মুহাম্মদ ইউনূস

মিনার মাহমুদ: স্মৃতিমধুর দিনগুলোর কথা এবিএম সালেহ উদ্দীন