এক.
সময়টা সম্ভবত ২০০৯সাল। তখন আমি একটা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলাম। সেই সংগঠনের উদ্যোগে শাহবাগ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে একটা পোগ্রাম করেছিলাম। ঐ প্রোগ্রামে মোজাফ্ফর স্যারকে অতিথি করতে প্রায় দুই তিন দিন তাঁর বাসায় গিয়েছি। একদিন বাসার সিকিউরিটি বলল, স্যার নামাজ পড়তেছে, বসেন। আমি স্যারের বাসায় ২য় তলায় অতিথি রুমে বসে আছি।
স্যার আসলেন। আমি দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে স্যার কথা বললেন। রাজি হলেন প্রোগ্রামে আসতে। আরো অনেক কথা হলো।
দুই.
প্রোগ্রামের দিন মোজাফ্ফর আহমদ, ব্যারিষ্টার তানিয়া আমির, ব্যাংক এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট ( নামটা এ মুহূর্তে মনে পড়ছেনা) সহ আরো কয়েকজন অতিথির সাথে আমিও বসে কথা বলছিলাম। বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো। একবার স্যার আমাকে বলল, মোবাইল নাম্বারটা সেভ করে দিতে। যদিও স্যার সেল ফোন খুব একটা ব্যবহার করতেন না। আমি সেভ করে দিলাম।
তিন.
দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন মোজাফফর স্যার। স্যারের সাথে সরাসরি যখন কথা বলতাম, তখন বুঝতাম, স্যারের মধ্যে কাজের বলিষ্ট নেতৃত্ব। স্যার প্রায়ই বলতেন, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি বন্ধ না হলে পুরোপুরি দুর্নীতি কখনো বন্ধ হবেনা। স্যারের মতো একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষ সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মোজাফ্ফর স্যার ছিলেন একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ।
গবেষক, প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ মোজাফ্ফর আহমদ ও নাগরিক আন্দোলন শিরোনামে এক লেখায় লিখেছেন, অধ্যাপক মোজাফফরের অর্থনীতি বিষয়ে মূল্যবান রচনা রয়েছে। শেষ জীবনে তার ইচ্ছা ছিল মহানবী (সা.) ও ইসলামী দর্শন বিষয়ে কিছু লিখবেন। কিন্তু গত ১০ বছর ধরে তার একটি দিনও অবসর ছিল না। আইনের শাসন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, পরিবেশের বিপর্যয় রোধ প্রভৃতি বিষয়ে আন্দোলন ও অনুষ্ঠানে তাকে প্রতিদিন অংশগ্রহণ করতে হতো। দুর্র্নীতির বিরুদ্ধে তার নেতৃত্বাধীন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যে প্রচারাভিযান চালায় তার তুলনা নেই। তিনি বাংলাদেশে আধুনিক নাগরিক আন্দোলনের জনক। ........গত কয়েক বছর আমি তার সফরসঙ্গী হয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার ঘুরেছি সারা দেশ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। ধর্ম ছিল তার ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়। কোন রকম গোঁড়ামির লেশমাত্র ছিল না তার মধ্যে। নামাজ আদায় করতেন ও রোজা রাখতেন নিয়মিত। নামাজের সময় হলে গাড়ির মধ্যেই আমাদের পাশে বসে ১০ মিনিটে নামাজ পড়ে নিতেন। অনেকের মতো গাড়ি থামিয়ে মসজিদ খুঁজতে যেতেন না। [ সূত্র: যুগান্তর,২৬/০৫/১২ ]
চার.
একদিন দুপুরে মোজাফ্ফর স্যারের বাসায় গেলাম। দিনটি ছিল শুক্রবার। জুমআর নামাজের পরে স্যার দেখা করলেন। মানুষ চিরঞ্জীব নয় আর তাই মৃত্যুর স্বাদ তাকে গ্রহন করতেই হয়। কিন্ত কিছু কিছু মানুষের চীরপ্রস্থান আমাদের বিশেষভাবে ব্যাথিত করে। তাঁর এই চলে যাওয়ায় আমরা হারালাম সকল সংকির্ণতার উর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য কথা বলার এক সাহসী সৈনিককে। যাদের সংখ্যা এ দেশে খুব বেশি নয়। মানুষ তার জীবদ্দশায় যা কিছু করে তার সবই রেখে প্রস্থান করে। অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ তার জীবদ্দশায় যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন আমরা যদি তা নিজেদের মধ্যে ধারন করতে পারি সেটাই হবে তার প্রতি সন্মান প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ উপায়। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ স্যারের শান্তি কামনা করছি।
# সাইফ বরকতুল্লাহ : সাংবাদিক
ঢাকা, ২৭মে/রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম/মতামত/এসবি